দেশের মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসছে শুধু তৈরি পোশাক খাত থেকে। তবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের (এলডিসি) পরবর্তী এ ধারা অব্যাহত রাখতে বাণিজ্য সক্ষমতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। বিশেষ করে দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক চর্চা বাড়ানো না গেলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা চ্যালেঞ্জ হবে। এজন্য সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে আরো শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক অনুশীলন করতে হবে।
রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল এক আলোচনা সভায় এ কথা বলেন বক্তারা। ‘রেসপনসিবল বিজনেস কন্ডাক্ট ফর রেসিলিয়েন্ট সাপ্লাই চেইনস অ্যান্ড ট্রেড কম্পিটিটিভনেস’ শীর্ষক এ সভা যৌথভাবে আয়োজন করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, ‘দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণ এখন আর কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্রেতা, বিনিয়োগকারী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং ভোক্তারা সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরে পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসন এবং ডিউ ডিলিজেন্স প্রক্রিয়ার ওপর অধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে টেকসই উন্নয়ন-সম্পর্কিত নতুন বিধি-বিধান ও প্রত্যাশা বাড়ছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।’
বাণিজ্যমন্ত্রী আরো বলেন, ‘বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ব্যবস্থার দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় বাংলাদেশ একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। শক্তিশালী রফতানি প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং প্রতিকূলতা মোকাবেলায় সক্ষমতার মাধ্যমে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির সময়ে আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে। কারণ সামনে দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা শুধু উৎপাদন ব্যয়ের ওপর নির্ভর করবে না; বরং টেকসই উন্নয়ন, স্বচ্ছতা, শ্রমমান, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা এবং দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক চর্চার ওপর নির্ভর করবে।’
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে করপোরেট জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় আইন দিন দিন কঠোর হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) “করপোরেট সাসটেইনেবিলিটি ডিউ ডিলিজেন্স ডিরেক্টিভ” এবং জার্মানির “সাপ্লাই চেইন ডিউ ডিলিজেন্স অ্যাক্ট”-এর কারণে বৈশ্বিক ক্রেতাদের এখন তাদের পুরো সাপ্লাই চেইনে মানবাধিকার ও পরিবেশগত মানদণ্ড বজায় রাখতে হচ্ছে। কোনো কারখানায় পরিবেশ দূষণ বা শ্রম অধিকার লঙ্ঘিত হলে ইউরোপীয় ক্রেতাদের ওপর দায় বা জরিমানা আরোপের বিধান রাখা হয়েছে, যা বাংলাদেশের পোশাক রফতানিকারকদের সরাসরি প্রভাবিত করছে। এছাড়া ২০২৬ সাল থেকে কার্যকর হওয়া ইইউর ‘কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম’ আমাদের মতো জ্বালানিনির্ভর দেশের ওপর অতিরিক্ত শুল্কের চাপ তৈরি করবে।’
ড. মাসরুর রিয়াজ আরো বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূচক অনুযায়ী, দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বড় ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে ১৪১টি দেশের মধ্যে আমাদের অবস্থান ১০৫তম। আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের বৈশ্বিক অধিকার সূচক বলছে, বাংলাদেশ শ্রমিকদের জন্য অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশগত দেশ। এসব চিত্র আমাদের জন্য সুখকর নয়।’
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে আরো শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও সহায়তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে বলে মনে করেন বাণিজ্য সচিব (রুটিন দায়িত্ব) মো. আবদুর রহিম খান। তিনি বলেন, ‘দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণের দিক থেকে বৈশ্বিক পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ নিয়ে এসেছে। যেসব প্রতিষ্ঠান স্বপ্রণোদিতভাবে দায়িত্বশীল অনুশীলন গ্রহণ করবে; তারা তাদের সক্ষমতা জোরদার, পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের কাছে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে পারবে।’
সভায় ইউএনডিপি বাংলাদেশের ডেপুটি রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ সোনালি দায়ারাত্নে বলেন, ‘রফতানি সক্ষমতা, বাজারে প্রবেশাধিকার, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের সামনে এখন একটি বড় সুযোগ রয়েছে—এমন একটি সুগঠিত জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা, যা নীতিগত সামঞ্জস্য জোরদার, স্থিতিস্থাপক সরবরাহ শৃঙ্খলকে উৎসাহিত এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।’
অনুষ্ঠানে ইউএনডিপির কান্ট্রি ইকোনমিক অ্যাডভাইজার ওয়াইস পেরিসহ সরকারি-বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী সংগঠন, উন্নয়ন সহযোগী, সুশীল সমাজ, শিক্ষাবিদ এবং শিল্প প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।